ডিজনিল্যান্ডে স্বপ্নভঙ্গ

বর্তমান আর্খিক বাজারের সঙ্কটের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে ১৯২০-৩০-এর গ্রেট ডিপ্রেশন বা ভয়ঙ্কর আর্থিক মন্দার। মাত্র এক সপ্তাহে আমরা দেথলাম আমেরিকা ও দূনিয়ার কয়েকটি সেরা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কের দরজা বন্ধ হতে। তলিয়ে যাওয়া ঠেকাতে খোদ মার্কিন সরকারের হস্তক্ষেপ ও ব্যর্থ। ওয়াল স্ট্রিট বাঁচাতে ৭০,০০০ কোটি ডলার ঢালার প্রস্তাব এনেছিল বুশ প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র একমাশের আগে এতবড় ঝুঁকি নিতে রাজি হল না মার্কিন কংগ্রেস। দ্রুত খুব দ্রুত সামলে না উঠতে পারলে এই ব্যর্থতার দায় নিয়েই হোয়াইট হাঊস ছাড়তে হবে বুশকে।সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা জাবে কি না কেঊ জানে না। জানা নেই সামনে আরো বড় সঙ্কট আছে কি না। এই পরিস্থিতিতে যে প্রশ্নগুলি ঊঠছে তা হলঃ

সমস্যা কতটা তীব্র?

মিডিয়ার একাংশ মনে করে, এ ধরনের সঙ্কট বিশ্ব আগেও দেখেছে। ঊদাহরন হিসেবে ১৯৯৭-৯৮ এর পূর্ব এশীয় আর্খিক মন্দার কথা বলা হয়। এই যুক্তি কিন্তু বিভ্রান্তিকর। পূর্ব এশীয় আর্থিক মন্দায় ব্রাজিল ও রাশিয়ার মতো বহু দেশ আক্রান্ত হয়েছিল। মুলত পুঁজিবাদী দুনিয়ার প্রান্তবর্তী যে-সব দেশে ওই সমস্যার ঊদ্ভব হয়, আক্রান্ত হয়েছিল তারাই। ঊন্নত রাষ্ট্রগুলিতে এর প্রভাব ছিল সামান্য। এমনকি চীন বা ভারতেও এর ফলে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। এই মুহূর্তে যে সমস্যার কথা বলা হচ্ছে, সেটা ঘটে গিয়েছে আধুনিক পুঁজিবাদের কেন্দ্র আমেরিকায়। সুতরাং সমস্যার চেহারাটাই ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।

প্রতিতুলনায় বলা হচ্ছে, আমেরিকাতেও এমন সমস্যা নতুন নয়। মাত্র কয়েক বছর আগে, ১৯৯০-এর দশকের শেষে এবং নতুন সহস্রাব্দের গোড়ায় কিছুটা অর্থনৈতিক সাফল্যের পরে এই জিনিসিই দেখেছে তারা। এটাও সেইভাবে কাটিয়ে ঊঠবে। এ ধরনের যুক্তিও আংশিক। মার্কিন অর্থনীতির আর্থিকক্ষেত্রে যে সঙ্কটের যে চেহারা দেখা যাচ্ছে, বাস্তব অর্থনীতিতে তা আরও মারাত্মক। খুঁটিনাটি নিয়ে পরে আলোচনা করব, তবে আপাতত এটুকু বললেই চলবে যে, আমেরিকার শ্রেষ্ঠ ঋণদায়ী ব্যাঙ্ক নিজেদের দেঊলিয়া ঘোষনা করার পর তাদের বাঁচাতে মাঠে নেমেচে দেশের সরকার। অন্তত সরকার তো জানে সমস্যা কতটা গভীর। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগমান হিসেব কষে দেখিয়েচেন, আমেরিকার বেকারিত্ব গত এক বছরে ৮.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০.৩ শতাংশ। পাঁচ বছর আগে দেশের সর্বোচ্চ বেকারির সূচক ছিল এরই খুব কাছাকাছি।

কী ঘটেছিল বাজারে?

প্রথমেই দেথা যাক ব্যাঙ্ক কীভাবে কাজ করে। ফেরত পাওয়ার আশাতেই ঋণ দেয় ব্যাঙ্ক। ঋণের সংগে যুক্ত থাকে যোগ্য জামিনদার অথবা যে প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়া হচ্ছে তার প্রকৃত মুল্যায়ন। হিসেব ঠিক থাকলেই ঋণের টাকা কতকটা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়।কোনও কারণে জামিনদার বা প্রকল্পের অবমূল্যায়ন ঘটলে ঋণ আদায়ের সম্ভাবনাও কমে। ঋণ আদতে ব্যাঙ্কের পুঁজি। ঋণ খেলাপ হলে নষ্ট হয় সেই মূলধন। এই পুঁজির ওপর নির্ভর করে ব্যাঙ্কও অন্য জায়গা থেকে ঋণ নেয়। সহজ যুক্তিতেই বোঝা যায়, মূলধন কমলে ব্যাঙ্কের ঋণ মেটানো কঠিন হয়। বাড়াবাড়ি ঋণখেলাপ হলে দেঊলিয়া হয় ব্যাঙ্ক।

এবার দেখা জাক আমেরিকার বাজারে ঠিক কী হয়েছিল। প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, মার্কিন বাজার আগাগোড়াই ভোগ্যপণ্য নির্ভর। নিজস্ব বাড়ি থাকাটা সে-দেশে সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু সকলেই তো আর বরাবর থাকবে বলে বাড়ি বানায় না। অনেকেরই লক্ষ্য থাকে ঠিক সময় বিক্রি করে মুনাফা আদায়। বাড়ির চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার ফলে আবাসন ক্ষোত্রে মূল্যস্ফূতিও আকাশ ছুঁল আমেরিকায়। আবাসনে লগ্নি করেন অসংখ্য মানুষ।

এই লগ্নির জন্য প্রয়োজন ছিল ব্যাঙ্ক ঋণের। ঋণ মিলত জামিনের বিনিময়ে। মূল্যস্ফীতির কারনে ২০০০ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে প্রায় সকলেই গৃহঋণ শোধ করায় ব্যাঙ্কের ধারণা হয়, এই ব্যাবসা খুবই লাভজনক। আবাসন ক্ষেত্রে বিপুল মূল্যস্ফূতির দরুন বাড়ি বেচেই ঋণ খেলাপের মোকাবিলা করা যাবে। আস্তে আস্তে জামিনের ব্যাপারে ব্যাঙ্কের মনোভাব নরম হয়। ঋণ-অজোগ্য ব্যক্তিরাও ঋণ পেতে শুরু করেন। ২০০৬ সালে জামিন-সহ মোট ঋণের ২০.১ শতাংশ ছিল চড়া সুদে সহজলভ্য ঋণ।

আবাসনে মূল্যস্ফীতির ফলে আশঙ্কার কোনও কারন ছিল না। কিন্তু অর্থনীতির সাধারণ সূত্র ধরেই এটা বেশিদিন চলতি পারেনি। আবাসনে বিপুল লগ্নির ফলে বাড়ির সংখ্যাও হুহু করে বেড়ে যায়। তবে ২০০১ থেকে ২০০৫-এর মধ্যে একদিকে বেকারিত্ব বৃদ্ধি ও অন্যদিকে মোট ঊন্নয়নে হ্রাসের কারণে বাড়ি বাড়লেও চাহিদা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ২০০৫-এর ডিসেম্বর থেকেই বাড়ির দাম পড়তে থাকে। ব্যাঙ্কের সমস্যা হয় দুই দিক দিয়ে। এক, যে মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকল্পের ঋণ নোওয়া হয়েছিল তা কমে যায়। দুই, কম মূল্যবান জামিনের ভিত্তিতে বেশি ঋণ দেওয়া হতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাঙ্কের পক্ষে ঋণ আদায় কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে।

ওপরের আলোচনা থেকে দুটি সমস্যা আমাদের নজরে আসে। প্রথমটি হল, চড়া সুদে সহজ ঋণ (সাব-প্রাইম লোন) দেওয়া হচ্ছিল কেন? দ্বিতীয়টি, আবাসন ও সহজ সুদের বাজার কীভাবে গোটা অর্থনীতির পক্ষে এত মারাত্মক হয়ে ঊঠল?

প্রথম প্রশ্নের ঊত্তর পাওয়া যাবে দুটি ঘটনায়। ১৯৮০-র দশক থেকে আমেরিকায় বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির মুনাফা কমতে থাকায় কিছু কড়াকড়ি শিথিল করতে বাধ্য হয়েছিলেন কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়াও দায়ী করা চলে লাগামছাড়া মুনাফার খিদেকে। প্রত্যেক ব্যাঙ্কই ভাবতে শুরু করে, তারা না দিলে অন্য কেঊ বোধহয় ঋণ দিয়ে লাভ করবে। শেষ অবধি সকলেই নেমে পড়ে ঋণের ব্যাবসায়।

সবার ওপরে ছিল ব্যাঙ্কের হাজারো ঊদ্ভাবন। ঋণ ও বানিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে মিলিয়ে এরা এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। গৃহ ঋণ ও সহজ সুদের সংগে জুড়ে যায় একাধিক ব্যাবসা। একটি ঊদাহরণ দিলে ব্যাপারটে বোঝা সহজ হতে পারে। ধরা যাক চড়া সুদে সহজ ঋণ নিলেন ক। ব্যাঙ্কের কাছে এটা মূলধন বা ভবিষ্যৎ আয়ের ঊৎস। এই মূলধন বিক্রি করতে ব্যাঙ্ক বাজারে ছাড়ল আলাদা প্রকল্প (এস পি ভি)। মূলধন বিক্রির সংগে জড়িত ঝুঁকিও ঢুকল বাজারে। এস পি ভি আদতে ব্যাঙ্কের সিকিঊরিটি বা জামিন। গ্রাহকরা এগুলি কিনে ব্যাঙ্কেরই অতিরিক্ত মূলধনের তহবিল সংগ্রহ করেন। আবার এই কাগজগুলিই হয়ে ওঠে গ্রাহকদের জামিন, যার ভিত্তিতে তারা ঋণ পেতে পারেন। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় জামিনকরণ। ২০০৬ সালে আনুমানিক ৮০.৫ শতাংশ সহজ ঋণ জামিনভুক্ত হয়েছিল।

এবার ধরা যাক, ক ঋণ নিয়ে ফেরত দিলেন না। ফলে ওই মূলধনের বিনিময় ব্যাঙ্কের আয় বন্ধ হল। ঊপযুক্ত জামিন না থাকলে প্রথম যে ব্যাঙ্ক ঋণ দিয়েছিল তার ক্ষতি হবে। আবার, জামিন থাকলে সেই সঙ্গে জামিনদারেরও ক্ষতি। প্রাথমিক মূলধন মূল্যহীন হয়ে পড়লে তার সঙ্গে জড়িত বাকি মূলধনেরও একই অবস্থা হয়। বাড়তে থাকে পাওনাদারদের তাগাদা। আমেরিকার বাজারে আর্থিক লেনদেনের এই জটিল নকশাই আবাসন ও সহজ ঋণ কে গোটা অর্থনীতির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। তার এই বিভ্রাটেই দেওলিয়া হল একাধিক বড় আর্থিক সংস্থা। সহজ করে বলা যায়, শিথিল আর্থিক নিয়ম, ঊপযুক্ত জামিন ছাড়া চড়া সুদে সহজ ঋণ ও লেনদেনের ভুল ব্যাবস্থাই আমেরিকা কে আজ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

লগ্নি করা অর্থ আদৌ ফেরত পাওয়া জাবে কিনা, এই আশঙ্কাই মানুষকে বাজার সম্পর্কে আস্থাহীন করে তুলছে। যাঁরা নির্দিষ্ট প্রকল্প জমা রেখে, ঊপযুক্ত জামিনে ঋণ চাইছেন, তাঁরাও ঋণ পাচ্ছেন না। মার খাচ্ছে বিনিয়োগ। বাজারে চাহিদা কমাচ্ছে বিপুল ছাঁটাই। শ্লথ হচ্ছে মার্কিন অর্থনীতি।

মার্কিন মডেল? সাবধান!

অর্থনীতির একটি তত্ব বলে, সরকার কথনওই আর্থিক সমস্যা মেটাতে পারে না। বাজারি অর্থনীতিতে সরকারকে 'ত্রাতা' হিসেবে না দিখে 'সমস্যা' হিসিবেই দেখা হয়। আমেরিকায় এই মুহূর্তে যে সঙ্কট হয়েছে, অর্থনীতি ও ব্যঙ্ক বাদে প্রধান বলি বাজারের একছত্র ক্ষমতা সম্পর্কে এই অন্ধ বিশ্বাস। গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় একবার প্রমানিত হয়েছিল যে বাজার সর্বেসর্বা নয়। আজ আবার হল। লাগামছাড়া খোলা বাজার যে কী ভয়ঙ্কর সমস্যা তৈরি করে, আমেরিকা তা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে। ব্যর্থ হলেও বেসরকারি ব্যাঙ্ক ও অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে স্রেফ ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে ৭০ হাজার কোটি ডলার দিতে এগিয়ে আসতে হয়েছিল সরকারকে।

'অপরাজেয়' মার্কিন পুঁজিবাদও আজ বিরাট এক প্রশ্নের মুখে। যাঁরা সবসময় মার্কিন আর্থিক ব্যাবস্থার গুনগান করেন, তাঁরাও আজ বুঝছেন কোন সঙ্কটে পড়েছে তাঁদের স্বপ্নের অর্থনীতি। ভারতকে যাঁরা আমেরিকার মডেলে চালাতে চান, তাঁরা সতর্ক হোন। ডিজনিল্যন্ডের স্বপ্ন ভেঙেছে। ভারত সরকার যে খোলাবাজারি অর্থনীতির পেছনে ধাওয়া করছে, তাতে লাগাম পরানোর সময় এসেছে। মুক্ত বাজার আমেরিকায় ব্যর্থ। ভারত সরকারের ঊচিত দেশবাসীকে যেচে অমন গাড্ডায় না ফেলা।

(লেখক ইকনমিক রিসার্চ ফাঊন্ডেশনের অর্থনীতিবিদ ও প্রগতির সম্পাদক সমিতির সদস্য)

3.75
Average: 3.8 (4 votes)
Your rating: None